• Home
  • জেলার খবর
  • ২১শে জুলাই বঙ্গ রাজনীতির এক কালো দিন, কলকাতার রাজপথে হয় গণতন্ত্রের মৃত্যু

২১শে জুলাই বঙ্গ রাজনীতির এক কালো দিন, কলকাতার রাজপথে হয় গণতন্ত্রের মৃত্যু

Image

দেবজিৎ মুখার্জি, কলকাতা: আজ ২১শে জুলাই। আজ শহরের বুকে পালন হবে শহীদ দিবস সভা। তবে এবার আর তা বড় করে পালন করা সম্ভব নয় তৃণমূলের। চলতি বছরে বিধানসভা নির্বাচনে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। বাংলার মসনদে বসেছে বিজেপি। তার উপর দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে দলটি – মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন কালীঘাট তৃণমূল এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। শুধু তাই নয়, দলের সিংহভাগ সাংসদ দলত্যাগ করে যোগ দিয়েছেন এনসিপিআইতে, যারা মোদি সরকারের সঙ্গে কাজ করবে বলে জানিয়েছে। রাজ্যসভাতেও দেখা গিয়েছে ভাঙন। এক কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যে সংসার নিজে হাতে গড়েছিলেন, তার অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে। 

তবে তা সত্বেও অল্প কয়েকজনকে নিয়েই শহীদ দিবস সভা করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউস চত্বরের জন্য অনুমতি চাওয়া হলেও তা মেলেনি। তারা এই কর্মসূচি পালনের অনুমতি পায় বিড়লা প্লানেটরিয়ামের সামনে। তাও আবার আড়াই হাজার সমর্থক নিয়ে। আদালতের তরফ থেকে একাধিক শর্ত চাপানো হয়েছে। সব মিলিয়ে, আর আগের মতো বড় করে এই কর্মসূচি পালন করতে পারবেন না কালীঘাটপন্থীরা। যদিও তারা রাজ্যবাসীর মনের দাগ কাটার বিষয়ে আশাবাদী।

এই ২১শে জুলাইকে ঘিরে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, যা এখন আর কারোর কাছেই অজানা নয়। বলা ভালো, এই রক্তে ভরা ইতিহাসের সাক্ষী যারা হয়েছেন, তাঁরা হয়তো আমৃত্যু মনে রাখবেন। তবুও আজ ‘এই বাংলার মুখ’ তুলে ধরবে সেদিনের ঘটনা। ঠিক কী ঘটেছিল এবং এরপর রাজ্য রাজনীতি কী মোড় নেয়, সবটাই তুলে ধরা হবে আজ আমাদের তরফ থেকে।

সালটা ১৯৯৩। বাংলায় তখন রাজত্ব চলছে সিপিএমের। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে জ্যোতি বসু। বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে তৎকালীন যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটার আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করার দাবি তোলেন এবং ২১শে জুলাই মহাকরণ (রাইটার্স বিল্ডিং) ঘেরাওয়ের ডাক দেন। সেই অনুযায়ী সকাল থেকে অজস্র যুব কংগ্রেস কর্মী-সমর্থক জড়ো হতে থাকেন। পুলিশের তরফ থেকে তাঁদের রোখার জন্য শহরের নানা জায়গায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। দুপুরের দিকে ব্যারিকেড ভেঙে মহাকরণের দিকে এগোনোর আন্দোলনকারীরা চেষ্টা করলে শুরু হয় পুলিশ-আন্দোলনকারী সংঘর্ষ। 

পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রথমে পুলিশ লাঠিচার্জ করার পাশাপাশি টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। তাতে আহত হন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। উত্তেজনা চরমে পৌঁছাতে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় পুলিশ। তাতে প্রাণ হারান ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী। শুধু তাই নয়, অনেকে আহতও হন। ঘটনাকে ঘিরে রীতিমতো তোলপাড় চলে রাজ্য রাজনীতিতে। সিপিএমকে পড়তে হয় বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এও দাবি করেছিলেন যে এই ঘটনা সিপিএমের পতনের কারণ হয়ে উঠবে। এরপর থেকেই প্রতিবছর ২১শে জুলাই শহীদ দিবস সভা পালন করা হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের তরফ থেকে।

২০১১ সালে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে, ক্ষমতাচ্যুত হয় সিপিএম। বাংলার মসনদে বসে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চ্যাটার্জির নেতৃত্বে গঠন করা হয় এক সদস্যের এক তদন্ত কমিশন, যা পরবর্তীতে তাদের রিপোর্টে জানায়, সেদিন ডোরিনা ক্রসিং বা মেয়ো রোডের মতো এলাকায় পুলিশের গুলি চালানো ছিল “অপ্রয়োজনীয়, উস্কানিমূলক এবং যুক্তিহীন”। তবে এই দিনটির প্রাক্কালে একপ্রকার বোমা ফাটায় সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার। 

২০শে জুলাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তদন্ত রিপোর্টটি পেশ করেন এবং বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, শহীদ পরিবার এবং আহতদের প্রাপ্য টাকা দেওয়া হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের তরফ থেকে। তিনি বলেছেন, “নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা দিতে বলা হলেও তৃণমূল সরকার নিহতদের পরিবারকে মাত্র ২ লক্ষ এবং আহতদের পরিবারকে ১৫ হাজার দিয়েছিল।” পরিবারগুলির পাশে থাকার আশ্বাসও দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে বলব ফ্রেশ এফআইআর করতে চাইলে বর্তমান সরকার সেই সুযোগ দেবে। যদি আপনারা কমিশনের সুপারিশ মেনে আর্থিক সাহায্য চান বর্তমান সরকারের কাছে, তা দেওয়া হবে।” মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে সেই টাকা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এবার দেখার বিষয় যে শুভেন্দু অধিকারী যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তিনি পূরণ করেন কিনা। শুধু তাই নয়, আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কংগ্রেসের তরফ থেকে কি বার্তা দেওয়া হয়, সেদিকেও নজর থাকবে সকল রাজ্যবাসীর। এই মহা কর্মসূচি থেকে কালীঘাট তৃণমূল ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারে কিনা, সেটা এই মুহূর্তে একটি বড় প্রশ্ন। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন যে আজ কিছু বড়সড় ঘোষণা করতে পারেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে এবার দেখার যে কী ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এই মুহূর্তে যে কালীঘাট তৃণমূলের প্রধান লক্ষ্য সংগঠনকে ফের চাঙ্গা করা, তা সহজেই অনুমেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top