দেবজিৎ মুখার্জি, কলকাতা: আর মাত্র তিনটে দিন! তারপরই জানা যাবে এবার বাংলায় কারা সরকার গঠন করবে। তবে ভোটের ফলাফল বেরোনোর আগে থেকেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে রাজ্যে। গতকাল, স্ট্রংরুমকে কেন্দ্র করে, রীতিমতো তান্ডব দেখা গেল ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র ও শাখাওয়াত মেমোরিয়াল চত্বরে। সন্দেহজনক গতিবিধির অভিযোগ তুলে গতকাল ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের বাইরে ধর্নায় বসে ছিলেন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম দুই প্রভাবশালী প্রার্থী – বেলেঘাটার প্রার্থী কুনাল ঘোষ এবং শ্যামপুকুরের প্রার্থী শশী পাঁজা। অন্যদিকে, শাখাওয়াত মেমোরিয়ালে পৌঁছান বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও। চার ঘন্টা পর তিনি বাইরে বেরোন।
ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের বাইরে মুখোমুখি হয় ঘাসফুল ও গেরুয়া, দুই শিবিরই। সেখানে ভালো সময় ধরে ধরনা করেন কুনাল ঘোষ ও শশী পাঁজা। বাইরে বের হতেই বিক্ষোভ দেখান পদ্ম শিবিরের কর্মীরা। ঘটনাস্থলে যান তাপস রায় ও সন্তোষ পাঠকের মতো বিজেপি প্রার্থীরাও। এলাকার বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রশ্ন, কেন ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। যদিও শুধু কর্মী-সমর্থক নয়, দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যেও চরম তর্কতর্কি দেখা যায়।
অন্যদিকে, শাখাওয়াত মেমোরিয়ালে রাত ৮টা নাগাদ আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। খবর পেয়েই সেখানে পৌঁছন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর এজেন্ট। তাঁদের সঙ্গে পুলিশের রীতিমতো বচসা শুরু হয় বলে খবর। সেখানে পৌঁছান কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমও। তিনি জানান, “শুনে এসেছিলাম আমি। কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না গেটের ভিতরে। থাকা যাচ্ছে বাইরে পর্যন্ত। ঢুকতে দেয়নি আমাকে।” চার ঘন্টা বাদে বেরোন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বেরিয়েই সবটা বলেন তিনি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, “পুরো এক পাক্ষিক ভোট হচ্ছে এটা। এসেছি উদ্বেগ ছিল বলেই। সিসিটিভি ফুটেজ আসছিল। একাধিক জায়গায় কারচুপি হচ্ছে বলে অভিযোগ আসছিল। ব্যালট এদিক-ওদিক করছে বাইরের লোক এসে। এই খবর শুনেই আমি ভাবি একবার দেখে আসি। এখানে তো আসার পর আমাকে যেতেই দিচ্ছিল না কেন্দ্রীয় বাহিনী। আমি বলি অধিকার আছে আমার যাওয়ার। শেষে ভিতরে ঢুকেছে আরওর অনুমতি নিয়ে। আমি মনে করি একটা জায়গা করে দেওয়া উচিত প্রেসের জন্য সিসিটিভি দেখার।”
এরপর একপ্রকার হুঙ্কার দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “জীবন-মরণ লড়াই হবে যদি কেউ ইভিএম লুঠের চেষ্টা করে। এটা তো আমার এলাকা। এলাকা থেকেই জড়ো হয়ে যেতে পারে এক সেকেন্ডে ১০ হাজার লোক। প্রয়োজন নেই বাইরে থেকে আনার।” এরপর ফের একবার উদ্বেগ প্রকাশ করে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, “বলছে সিল করেছে। কিন্তু ও তো রেখে দিয়েছে ব্যান্ডেজ করে। খুলতে পারে যে কোনও সময়।” তবে কারা কারচুপি করতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিষ্কার কথা, “এর জন্য ইশারাই কাফি হে।” পাশাপাশি, তিনি এও জানান যে অন্তিম দফার ভোট ও গণনার দিনের ফারাক নিয়েও ‘চক্রান্তের’ গন্ধ পাচ্ছেন।
যদিও তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে তোলা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয় কমিশনের তরফ থেকে। নানা উত্তেজনার মাঝে সাংবাদিক বৈঠক করে তারা। তাতে উপস্থিত ছিলেন খোদ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগারওয়াল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডিইও নর্থ স্মিতা পান্ডে। তাঁরা পুরো বিষয়টি তুলে ধরেন সাংবাদিকদের এবং দাবি করেন যে যেই অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
স্মিতা পান্ডে বলেন, “৭টা বিধানসভার স্ট্রংরুম রয়েছে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে। কালকেই সম্পূর্ণভাবে স্ট্রংরুম সিল করা হয়েছে সকল প্রার্থী ও তাঁদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে সব কাজ শেষ করে। সেই ছবি দেখাও যাচ্ছে বাইরে থেকে। আজকে প্রথাগত বিধি মেনেই কাজ হচ্ছিল আমাদের পোস্টাল ব্যালটের।” এরপরই ঘটনার সময়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁর বক্তব্য, “অন্য ঘরে ছিল পোস্টাল ব্যালট। স্ট্রংরুম ছিল পোস্টাল ব্যালটের। পোস্টাল ব্যালট আলাদা করার কাজ চলছিল বিধানসভা ধরে ধরে। সেই কাজ অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসাররা করছিলেন। সব কাজ নিয়ম অনুযায়ী হচ্ছিল। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে আমরা মেল করেছিলাম। সকাল দশটায় জেলা থেকে মেল করা হয়েছে। জানানো হয়েছে সমস্ত প্রার্থী ও এজেন্টদের। পুরোপুরি মিথ্যা না জানানোর অভিযোগ।”
পাশাপাশি, প্রার্থীরাও যে সেখানে হাজির ছিলেন এবং সবটা দেখেছিলেন, তাও জোর দিয়ে বারবার বলেন স্মিতা পান্ডে। তাঁর বক্তব্য, “কুনাল ঘোষ, শশী পাঁজাও ছিলেন। এজেন্ট এসেছিলেন সন্তোষ পাঠকের। আমি নিজে ওনাদের নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছি যে ঠিক আছে সব। রেকর্ড করা হয়েছে সেটাও। সুতরাং যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তা পুরোপুরি মিথ্যা।” অন্যদিকে, মনোজ কুমার আগারওয়াল স্ট্রংরুমের সামনে হওয়া অশান্তি নিয়ে বলেন, “ভোটকর্মীদের ব্যালট ছিল। পুরোপুরি আলাদা ইভিএমের স্ট্রংরুম। ব্যালট স্ট্রংরুম থেকে বিধানসভা ধরে ধরে আলাদা করার কাজ চলছিল। কুনাল ঘোষ, শশী পাঁজা এসেছিল। সব দেখেছেন ওনারা।”
ভোটের ফলাফলের আগে এমন ধরনের ঘটনা যে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনার মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে, তা বলাই বাহুল্য। দ্বিতীয় দফার ভোটের পর থেকে যেভাবে একের পর এক হিংসার ঘটনা বা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের রাজনীতি চলছে, তাতে ভোটারদের মনে প্রশ্ন উঠছে যে কেমন হতে চলেছে ফলাফল। তার উপর রয়েছে নানা এক্সিট পোল। সব মিলিয়ে, রাজ্য না রণক্ষেত্র, তা বোঝাই যাচ্ছে না। তবে সবটা শেষ হবে ৪ তারিখে। সেদিনই বোঝা যাবে কাদের ক্ষমতায় দেখতে চান রাজ্যবাসী।



By










