একটি কণ্ঠ কীভাবে একসঙ্গে প্রেম, দুঃখ, দুষ্টুমি, উন্মাদনা, শাস্ত্রীয় সুর, ক্যাবারে, গজল থেকে পপ সংস্কৃতির ভাষা হয়ে উঠতে পারে—তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ সুরসাম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে। আজ, ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ৯৩তম জন্মদিন। ১৯ ৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাংলিতে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পী দীর্ঘ ৮ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগীত জগতকে তাঁর জাদুকরী কণ্ঠে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের হিসেব অনুযায়ী, ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় হাজার হাজার একক, দ্বৈত ও কোরাস গান রেকর্ড করে তিনি সংগীতাঙ্গনে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ভীতি থেকে বিশ্বরেকর্ড: সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ‘আশাজি’
পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের পরিবারে জন্ম হলেও, মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আশাকে। জীবিকার তাগিদে মাত্র ১০ বছর বয়সে, ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এর জন্য প্রথমবার মাইকের সামনে দাঁড়ান তিনি। লতা মঙ্গেশকরের মতো প্রবাদপ্রতিম গায়িকার ছোট বোন হওয়া সত্ত্বেও, নিজের স্বকীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। চপলতা, সাহস, রোম্যান্স ও কামনার মেলবন্ধনে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন তিনি।
ও পি নায়ার ও পরবর্তীতে আর ডি বর্মণের (পঞ্চম) সুরসংযোজনে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইয়ে মেরা দিল’, ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো গানগুলি হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতের ইতিহাসই বদলে দেয়। ‘উমরাও জান’ এবং ‘ইজাজত’ ছবির গানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। পরে ২০০০ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ এবং ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে।
জীবনরসিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব
কেবল প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবেই নয়, ব্যক্তি আশার জীবন নানা বর্ণময় গল্পে ভরা:
| ক্ষেত্র | অনন্য তথ্য ও ঘটনা |
| আর ডি বর্মণ ও মিষ্টি রসিকতা | ১৯৭৯ সালে আর ডি বর্মণের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ঘরের কাজ ও রান্নার প্রতি ভালোবাসার কারণে একবার জন্মদিনে আশাকে ঝাড়ুর মধ্যে মাছ মুড়িয়ে মজার উপহার দিয়েছিলেন আর ডি বর্মণ! |
| রেস্তরাঁ ব্যবসায়ী ও শেফ | মুম্বাইয়ের শিল্পী-সাংবাদিকদের রান্না করে খাওয়ানো ছাড়াও ২০০২ সালে দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক রেস্তরাঁ ‘Asha’s’ খোলেন তিনি, যার শেফদের তিনি নিজেই প্রশিক্ষণ দেন। |
| আন্তর্জাতিক প্রভাব | ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘Cornershop’ তাঁকে সম্মান জানিয়ে ‘Brimful of Asha’ গানটি তৈরি করে, যা ইউকে সিঙ্গলস চার্টের শীর্ষে পৌঁছায়। এ ছাড়া বয় জর্জ, মাইকেল স্টাইপ এবং ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। |
| অভিনয় আত্মপ্রকাশ | ৮০ বছর বয়সে ‘মাই’ (Mai) ছবিতে আলঝাইমার্সে আক্রান্ত এক মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন। |
বাংলা সংগীতেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘কথা হয়েছিল’-র মতো অজস্র কালজয়ী গানে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কণ্ঠের ছোঁয়া। বয়সকে তোয়াক্কা না করে নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রাণবন্ত রসবোধই তাঁকে আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তাঁর শুভ জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত ও সুরপ্রেমী তাঁর দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন কামনা করছেন।



By












