আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কমাতে ব্রিকস (BRICS) গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন ডলারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদান ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করে তোলার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে বাস্তব উপাত্ত বলছে ভিন্ন কথা। মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার জেরে চীন ও রাশিয়া তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে অভূতপূর্ব গতিতে ডলার বর্জন শুরু করেছে, যার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক রিজার্ভ ও বাণিজ্যিক মুদ্রার ওপর।
চীন-রাশিয়া অর্থনৈতিক সমীকরণ ও বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর চীন ও রাশিয়া বিকল্প পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে:
| প্রযুক্তি ও ক্ষেত্র | বর্তমান স্থিতি ও কৌশলগত পরিবর্তন |
| দ্বিপাক্ষিক লেনদেন | চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি এখন ইউয়ান ও রুবেলে সম্পাদিত হচ্ছে (যার মধ্যে ইউয়ানের ভাগ প্রায় ৭০%)। |
| বিকল্প ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক | আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন ‘SWIFT’-এর বিকল্প হিসেবে চীন গড়ে তুলেছে CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) এবং রাশিয়া চালু করেছে SPFS। |
| জ্বালানি বাণিজ্য | রাশিয়া থেকে চীনে রফতানি হওয়া অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার মূল্য সরাসরি ইউয়ান ও রুবেলে পরিশোধ করা হচ্ছে। |
| ডিজিটাল মুদ্রা | প্রচলিত বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এড়াতে চিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের সিবিডিসি বা ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহারের তোড়জোড় চালাচ্ছে। |
ভারতের অবস্থান: ‘বহুমেরু’ আর্থিক ব্যবস্থা ও স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার
চীন ও রাশিয়া আগ্রাসীভাবে ডলার কমানোর নীতি নিলেও, ভারতের কৌশল তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী, সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ:
-
বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থা (Multi-polar Financial Order): নয়াদিল্লি কোনো একটি একক মুদ্রার (ডলার বা ইউয়ান) আধিপত্যের বদলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরু অর্থ ব্যবস্থার পক্ষে।
-
টাকার আন্তর্জাতিকীকরণ: ভারত রুপি (INR)-তে আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়াতে আগ্রহী হলেও চীনের ‘ইউয়ান’-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
ব্রিকস দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা হলো বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা (Trade Imbalance)।
উদাহরণস্বরূপ, ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনলেও, রাশিয়া ভারত থেকে সমপরিমাণ পণ্য আমদানি করে না। এর ফলে রাশিয়ার রিজার্ভ ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় টাকা (INR) জমা হচ্ছে, যা অন্য দেশে ব্যবহার করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ডলার বা ইউয়ানের মতো রুপি এখনো সর্বজনগ্রাহ্য মুক্ত রূপান্তরযোগ্য (Freely Convertible) মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণকারী ব্রিকস জোটের এই কৌশলগত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের একক আধিপত্যের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।



By












