নেপালের হড়পা বানে স্বজনহারাদের হাহাকার: বাবা-মায়ের অপেক্ষায় ১২ বছরের সেরিং, কাঠমান্ডুর মঠে ৫২০ শরণার্থীর অনিশ্চিত জীবন
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম, কাঠমান্ডু:
ক্যামেরার সমনে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে ১২ বছরের কিশোর সেরিং। চারপাশের কোলাহল ও ভিড় দেখে সে ভাবছে হয়তো বিশেষ কিছু ঘটছে। কিন্তু অবোধ শিশুটি জানে না, ২৬ অগস্ট নেপালের রাসুয়া এলাকায় বরফাবৃত হিমবাহের ধসে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করী হড়পা বানে ভেসে গেছে তার ঘরবাড়ি। আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না তার বাবা ফুরসাং এবং মা কাম্মি। “বাবা-মা জঙ্গলে গেছেন, রাস্তা ভাঙা বলে ফিরতে বছর দুয়েক সময় লাগবে”—স্বজনদের দেওয়া এই মিথ্যে আশ্বাসের ওপর ভর করেই কাঠমান্ডুর এক বৌদ্ধ মঠে দিন কাটছে পিতৃহারা-মাতৃহারা বালকটির।
হিমালয়ের কোল ঘেঁষে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে তুষার ও পাথরের ধস নেমে নদী উপত্যকা প্লাবিত করার পর নেপালে এখনও পর্যন্ত ১,৩০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ। মানচিত্র থেকে মুছে গেছে একের পর এক পাহাড়ি গ্রাম।
কাঠমান্ডুর মঠে আশ্রিত ৫২০ জীবন: শোক ও টিকে থাকার লড়াই
রাসুয়া থেকে ঘরছাড়া প্রায় ৫২০ জন দুর্গত মানুষ এখন কাঠমান্ডুর আশ্রয় মঠে ঠাঁই নিয়েছেন। ভিটেমাটি ও স্বজনহারা এই মানুষদের পুনর্বাসনে মঠের ভেতরের চিত্র:
-
নিখোঁজের তথ্যকেন্দ্র: মঠের প্রবেশদ্বারে তৈরি করা হয়েছে একটি তথ্যকেন্দ্র, যেখানে প্রতিটি আশ্রিত মানুষের নাম নথিভুক্ত করা হচ্ছে—যাতে ভবিষ্যতে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে সাহায্য হয়।
-
শিশুদের আলাদা জগত: মা-বাবা হারানো শিশুদের চোখের জল মোছাতে মঠের এক কোণে তৈরি করা হয়েছে খেলনা, দোলনা ও ফুটবলের ব্যবস্থা। খেলাধুলার মাঝে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিপর্যয় ভুলে হেসে উঠছে সেরিংয়ের মতো শিশুরা।
-
চিকিৎসা ও খাবারের সুব্যবস্থা: মঠেই তৈরি হয়েছে অস্থায়ী রান্নাঘর ও শৌচাগার। চাল, ডাল, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় কম্বল মজুত রাখা হয়েছে।
‘চোখের সামনে সব ভেসে গেল’: হাহাকার সর্বশান্তদের
মঠে আশ্রিতদের গল্পে কেবলই হারানো অতীত ও প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা:
| ব্যক্তি / স্বেচ্ছাসেবক | বিপর্যয়ের বিবরণ ও করুণ বাস্তবতা |
| শ্যাম বাহাদুর তামাং (৪০) | ৩৫ বছরের পুরোনো ভিটেমাটি চোখের সামনে ভেসে গেছে। দাদাকে বাঁচাতে গিয়ে মা ও দাদাকে চিরতরে হারিয়েছেন। সঙ্গে কেবল স্ত্রী ও কন্যা বেঁচে আছেন। |
| বুজুং (মঠের স্বেচ্ছাসেবক) | নিজের গ্রামের ৪৩টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৫০ জনের বেশি নিকটাত্মীয়কে হারিয়েছেন। মঠের একটি টেবিলে তিনি হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ছবি সাজাচ্ছেন—যা একসময় স্মৃতিচিহ্ন হয়ে উপচে পড়ছে। |
কাঠমান্ডু শহরের স্বাভাবিক ছন্দ বহাল থাকলেও মঠের ভেতরে ৫২০ জন মানুষ এখন আটকে আছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝখানে। কেউ পথ চেয়ে আছেন নিখোঁজ স্বজনের সংবাদের আশায়, আবার ১২ বছরের সেরিং অপেক্ষা করে আছে তার বাবা-মায়ের ফিরে আসার আশায়—যে মা-বাবা আর কোনো দিন সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকবেন না।



By














