হাতে বোনা পাটের ব্যাগপ্যাক থেকে বেরোচ্ছে নানা বর্ণের ফ্যাকাশে, আঁশ-ওঠা বিশেষ কাগজ। বার্ধক্যজনিত কারণে হাত কাঁপলেও সযত্নে সেগুলি লম্বা টেবিলে সাজিয়ে রাখছেন বিশ্বখ্যাত ‘মাস্টার পেপারমেকার’ আসাও শিমুরা (Asao Shimura)। হারিয়ে যেতে বসা জাপানের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ‘ওয়াশি’ (Washi) কাগজের পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে যিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন, সেই জাপানি শিল্পী এখন বাংলায়। সিমা আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত এক প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি এবং একদল বাঙালি শিল্পী প্রদর্শন করলেন কীভাবে জাপানি কলাকৌশল ও রাঢ়বাংলার জৈব উপাদান মিলেমিশে একাকার হতে পারে।
বাংলায় ‘ওয়াশি’ কাগজের নবজন্ম
অবিভক্ত বাংলায় মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপিতে হাতে তৈরি কাগজ ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে তা হলদেটে ও ক্ষয়ে যেত। কিন্তু জাপানি ‘ওয়াশি’ (যার ‘ওয়া’ অর্থ জাপান এবং ‘শি’ অর্থ কাগজ) প্রাকৃতিক তন্তুতে তৈরি হওয়ায় শত শত বছরেও নষ্ট হয় না বা ছিঁড়ে যায় না।
যেহেতু ‘ওয়াশি’ তৈরির মূল উপাদান বাংলায় মেলা কঠিন, তাই শান্তিনিকেতনের ‘ক্রিয়া আর্ট কালেক্টিভ’-এর দুই শিল্পী কিংশুক সরকার ও তাঁর স্ত্রী রেশমি বাগচী সরকার শিমুরার নির্দেশে এবং জাপানের হিগাশিয়োসাকা কলেজের সহ-অধ্যাপক মিদোরি ইয়ামামোতো-র সহযোগিতায় বাংলার স্থানীয় উপকরণ দিয়ে এই শিল্পের ভারতীয় সংস্করণ তৈরি করেছেন।
বর্জ্য পদার্থ ও লালমাটি থেকে উদ্ভাবন
সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব এই প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে টেকসই কাগজ ও অন্যান্য সামগ্রী:
-
জৈব উপকরণের ব্যবহার: আনারস, ওল ও কচুর বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য, পাট এবং বাঁশের তন্তু দিয়ে তৈরি হচ্ছে শক্ত কাগজ।
-
বায়োফিলিক লেদার: সম্পূর্ণ উদ্ভিজ উপাদান দিয়ে চামড়ার বিকল্প হিসেবে ‘বায়োফিলিক লেদার’ তৈরি করা হচ্ছে, যা এতটাই শক্ত যে স্টিলের মতো সবজি কাটার কাজেও ব্যবহার করা যাবে।
-
লালমাটির প্রাকৃতিক রং: বীরভূমের লালমাটি ও খনিজ পদার্থ থেকে প্রায় ২৭০–২৮০ ধরনের প্রাকৃতিক রং প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাচীন দেওয়ালচিত্র বা কাগজ রাঙানোর পাশাপাশি এই রং প্রসাধনী শিল্পেও ব্যবহারের চিন্তাভাবনা চলছে।
ঐতিহ্যের শিকড়ে ফেরা
জাপানি সংস্কৃতির সাথে শান্তিনিকেতনের সখ্য শতবর্ষের পুরোনো। কবিগুরুর সেই মুক্ত প্রাঙ্গণেই শিমুরার অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত হয়েছে বাঙালি শিল্পীদের আধুনিক চিন্তা। শিমুর ভাষায়, “জাপানি পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি কাগজের আয়ু হাজার বছরেরও বেশি। এতে কৃত্রিমতার স্থান নেই এবং তা প্রকৃতির ক্ষতি করে না।” শত বছরের পুরোনো এই ঘরানা এখন বাংলার লালমাটির ছন্দে এক নতুন শিল্পের উন্মেষ ঘটাচ্ছে।



By












